অচেনা-amadersujanagar.com
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

অচেনা

অচেনা

শফিক নহোর

 

নীলার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় তিন মাস। ওর শিশু সুলভ আচরণ আমাকে খুব কাছে টানে কারণে-অকারণে। ও আমাকে ফোন দেয়। আমিও মাঝে মধ্যে ওকে ফোন করি। আমার আর নীলার মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে ওঠে অল্প ক’দিনে। আমি অনেক বার বলেছি, তোমার ফেসবুক আইডি আমাকে দাও। ফেসবুকে আমরা কথা বলি। নীলা আমাকে বলেছে, তার ফেসবুক আইডি নেই। আমি একটা ফেসবুক আইডি তৈরি করে দিতে চেয়েছি; সে আমাকে বলল, ভালো একটা ফোন কিনে নেই তার পর দিও।
হঠাৎ করে নীলার ফোন নম্বর বন্ধ। আমি আর নীলার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।

আমি রাজবাড়ি হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পার হয়ে ঢাকা যাচ্ছি, খুব পরিচিত একটা মুখ আমাকে দেখে ওড়না দিয়ে নিজেকে আড়াল করবার ব্যর্থ চেষ্টা করল। আমার মনের ভেতর সন্দেহ হলো। আমি একটু আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলাম। মেয়েটি কোন সাড়া শব্দ দিল না। আমি লজ্জায় আর কথা না বাড়িয়ে ফেরির দ্বিতীয় তলায় উঠে গেলাম।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

মিনিট দশেক হতে চললো মেয়েটিকে আর দেখতে পেলাম না। আমি স্বস্তি পাচ্ছি না। আমার কপাল ঘেমে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে আমার সঙ্গে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার খুব অস্থির লাগছে। মেয়েটি আমাকে দেখে লুকাবে কেন? হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখে আমি নিজেকে দাঁড় করাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর, আমি চা পান করবার জন্য ক্যাবিন থেকে বেড় হলাম। হলুদ জামা, কালো চশমা পড়া মেয়েটির দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতেই দেখি নীলা!
প্রশ্ন করলাম,
—নীলা, তুমি?

সে কোনো কথা বলছে না। কেমন একটু ভঁড়কে গেল। আমি আবারও তাকে প্রশ্ন করলাম।
—কী ব্যাপার নীলা, কথা বলছ না কেন?
—তোমার সঙ্গে দেখা হবে ভাবতেই পারি নি।
মেয়েটি একটু আড়ালে গিয়ে মৃদু স্বরে আমাকে বলল,
—হ্যালো মিস্টার, আপনি ভুল করছেন। সুন্দরী মেয়ে দেখলে পিছু নিতে ইচ্ছে করে?
তার কথাটি আমার কাছে বিষের মত লাগল, আমি ভীষণ লজ্জা পেলাম। সরি বলল, কিন্তু আমার পা সামনে এগিয়ে যেতে পারছে না মনে হচ্ছে। কে যেন আমার পা বেঁধে রেখেছে।
—আমার নাম রুমা। আপনি কাকে যেন খুঁজছেন? নীলা না ফিনা আমি সে না। প্লিজ, আপনি আমাকে ফলো করবেন না। আমার কাছে অস্বস্তি লাগে।

আরও পড়ুন গল্প  ওরা তেরোজন

—আচ্ছা, বলুন তো।
—আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেন? আপনি কী সাংবাদিক, না কি গোয়েন্দা বাহিনীর কেউ?
তখন আমার নিজের কাছেই নিজেকে অপরিচিত মনে হচ্ছে।
—আমি দুঃখিত, প্লিজ কিছু মনে করবেন না। এ বলেই চায়ের পাঁচ টাকা বিল দিয়ে বিদায় নিলাম। এর মাঝে নীলার নম্বরটি ফোন করবার জন্য চেষ্টা করেছি। অনেকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা মোবাইল সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নীলার পাঠানো পুরাতন বার্তা গুলো মোবাইলের ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে পড়ছি। নীলা আমাকে চিনতে পারল না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি ঢাকা চলে আসলাম।

রাতে নীলার ফোন, আমি অবাক হলাম।
—তোমার বাড়ি না পাবনাতে? তুমি এ পথ দিয়ে ঢাকা কেন?
—মানে কি?
—আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
—আজ তোমাকে দেখলাম। আমাকে না চিনবার ভান করবার কী ছিল?

—সে অনেক কথা তোমাকে অন্যদিন বলব।

 আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

নীলার গায়ের গন্ধে আমি কিছু আন্দাজ করতে পারছিলাম।
স্বামীর ক্যান্সার, টাকার অভাবে অন্য একটা রাস্তায় যেতে হয়েছে নীলার। কিছুদিন পরেই স্বামী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় অজানার ঠিকানায়। আপন মানুষগুলো পর হয়ে যায় অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে। পরিবারের মানুষ ইচ্ছে করলে নীলার স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারতো, কিন্তু কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় নি। স্বার্থের কাছে আপন মানুষ গুলো খুব সহজে পর হয়ে যায়। নীলা ফোনে আমাকে তাই বলেছিল। অনেক গুলো সান্ত্বনার বাণী আমার কাছে তখন জমা ছিল। কিন্তু একটা বাণীও আমি লীলাকে শোনাতে পারি নি। নীলা চেষ্টা করেছিল সৎ পথে চলতে, পারে নি। আপন দেবর দুই হাজার টাকা দিয়ে, তার প্রথম কাস্টমার হয়েছিল নিজের ঘরে। নীলা, প্লিজ আবার দেখা হলে আমাকে চিনে নিও!

আরও পড়ুন শফিক নহোরের গল্প-
পুরাতন বটবৃক্ষ
আড়ালের চোখ
নীরুর মা

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

অচেনা

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!