সরদার-জয়েনউদ্দীন-৬ষ্ঠ-পর্ব
বই পর্যালোচনা,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

সরদার জয়েনউদ্দীন (৬ষ্ঠ পর্ব)

সরদার জয়েনউদ্দীন (৬ষ্ঠ পর্ব)

 

সাহিত্য মূল্যায়ন:

কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ান ঢুলী’। নয়ান ঢুলী গল্পগ্রন্থের কানা ফকিরের ব্যাটা, ফুলজান গল্প পর্যালোচনা-

 

কানা ফকিরের ব্যাটা

মায়ের নিকের পক্ষের স্বামী নসিব মিঞা। লোকে বলে কানাফকির। কোলটুও কানাফকির বলেই ডাকে। ‘কানা ফকিরের ব্যাটা’ গল্পে কোলটুর চরিত্র নজর কাড়ে। ওর বাপ তোরাপ বেপারী, ব্যবসা-বাণিজ্য করত; মরিচ-পটোলের বেপারী ছিল। অথচ আজ সে কানাফকিরের বেদম মার খায়। কারণ ওর সঙ্গে ভিক্ষে করতে যায় না এই অপরাধে। কোলটু আর ওর মা এভাবে অত্যাচার সহ্য করতে করতে কখনো সত্যিই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তবে কানাফকিরের হাজারো যুক্তি দিয়ে অপমান-অশ্রাব্য গালিগালাজ করে। একদিন কোলটু বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। ওর বয়সী ছেলেরা স্টেশনে কুলিগিরি করে পয়সা রোজগার করে। চ্যারাগের সঙ্গে সেও কুলিগিরি করবে বলে মনস্থির করে। কানাফকিরের মতো ভিক্ষা করে জীবন চালানো কোনো সম্মানের কাজ নয়। ওর মাও ভিক্ষাকে ঘৃণা করে। গল্পে দেখা যায়, একজন মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার মধ্যে আছে অনেক তৃপ্তি-আনন্দ। সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কোলটুর ভেতর দিয়ে সভ্যতাকে দেখা যায়। জীবনের রং স্পর্শ করা সম্ভব হয়।

 

ফুলজান

‘ফুলজান’ গল্পে একজন দশ বছরের বাবলুকে দেখা যায়, যার পিতা কবির মাস্টারের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে গড়ে তুলবেন দেশের গৌরবের জন্য। মানুষের মতো মানুষ করে। কিন্তু সে-স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে গেল। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে কবির মাস্টারের গ্রামে একটা নামও ছিল। তাই সময়-অসময়ে রাত্রিদিন ডাক পেলেই কলেরা রোগীকে দেখে। রোগ দেখে একফোঁটা ডোজ দিয়ে আসতে হয়। শেষাবধি কলেরার আক্রমণে তাকেও চলে যেতে হলো একদিন আকস্মিকভাবে। বাবলু হলো এতিম। নবীনগরের কবির মাস্টারের ভিটে ছেড়ে ফুলজান পেটের দায়ে ছলিম সরদারের ঘর করতে যায় দশ বছরের বাবলুকে নিয়ে চরসানিকদে। চোখে অনেক স্বপ্ন ছিল। একদিন দিন ফিরবে; কিন্তু সবই ভুল হলো।

আরও পড়ুন গল্পগ্রন্থ মায়াকুসুম রিভিউ

ছলিম কারণে-অকারণে মা-ছেলেকে অত্যাচার করতে থাকে। দিনে দু-চারবারও নির্যাতন চলে অতটুকু বাবলুর ওপর। করূণ চোখে তাকিয়ে থাকে আর বলে, মা-মা… ছলিম পাষাণ মানুষ। হুঙ্কার আর মারমুখী ভাব সবসময়। সহ্য করতে পারে না ফুলজান ছেলের ওপর এত অত্যাচার। একদিন বাবলুকে বলে, আমি তোর মা নই। তোর মার নবীনগরের মাস্টারের বাড়িতে সমাধি হয়েছে। এখানে তোর কেউ নেই, মামুদের বাড়ি যা। তারপর আরেকদিন দুহাতে ঠেলে বের করে দেয় ছেলেকে। যাওয়ার সময় দুটো পান্তা খেতে চেয়েছিল, তাও দেয়নি। বলেছিল, তোর পাতে ভাত আর উঠবে না। ঘরের বেড়া ধরে অনেক কেঁদেছিল বাবলু। তারপর বেরিয়ে যায়, কোথায় হারিয়েছে কেউ জানে না। লোকে বলে, মিলিটারি ধরে নিয়ে গেছে চাকরি দেবে বলে। ফুলজান সবই সহ্য করেছে। যেদিন ছলিম ওকে তালাক দিয়েছিল, সেদিনও মুখ বুজে স্বামীর ভিটে ছেড়ে আর্তনাদ করে বলেছিল, হায় অদৃষ্ট!

গল্পে পাঠক একজন সংগ্রামী ফুলজানকে দেখতে পান। যে আজ ভাগ্যদোষে অন্যের বাড়ির ঢেঁকিপাড়ার ধানবারানি। ফুলজানের চেহারা-সুরত ভালো বলে নবীনগরের মাতবর রশিদ মিয়া রসিকতা করে নিকে করতে চেয়েছিল। একবার ভেবেছিল গেলেও মন্দ কী। কিন্তু মন সায় দেয়নি, বাবলুর অপেক্ষায় থাকবে। সে নিশ্চয় একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু আবার মন বলে, সে কি সত্যিই আর ফিরে আসবে? যুদ্ধ তো কবে শেষ। তবে কি যুদ্ধের ময়দানে কোথাও হারিয়ে গেল? স্বপ্ন শেষ হলেও আশা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। ফুলজান সেই আশায় বুক বাঁধে। স্বপ্নহীন আশাহীন মানুষের জীবনের গল্প এভাবেই একটা অন্ধকার-বাঁকে এসে থিতু হয় অথবা হারিয়ে যায়। তারপরও ফুলজানেরা-বাবলুরা-কবির মাস্টারেরা বেঁচে থাকে মানুষের আকাঙক্ষায় আপন বৃত্তে। সরদার জয়েনউদ্দীন এভাবেই প্রতি গল্পের ছত্রে-ছত্রে দাগ রেখে গেছেন, সে-দাগ আমাদের অনেক দূরে নিয়ে যায়। আমরা তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকি তাঁর গল্পের কাহিনিমালার দিকে। গল্পের বাঁকে-বাঁকে এত জীবন্ত ছবি, তা যেন আমাদের জীবন বা পারিপার্শ্বিক ছবি, চিত্রায়িত হয়েছে বিশাল ক্যানভাসে। সত্যিকার সাহিত্যিকই তো সেই ক্যানভাসকে ফুটিয়ে তোলেন জগতের মুখোমুখি।

আরও পড়ুন চকখড়ি উপন্যাস রিভিউ

ভাষায় গতিময়তায় অসামান্য ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পেরেছেন সরদার জয়েনউদ্দীন। কোনো কোনো গাল্পিকের কোনো একটি গল্পের ভাবকল্পে, তার অন্তর্বয়ন ও শিল্পনির্মিতির স্বাতন্ত্র্যে কিংবা নির্মিতির স্রষ্টার শিল্পীসত্তার বিম্বিত রূপ অনুসন্ধান তীব্র অবিনাশী পুনর্নির্মাণ। হয়তো তা বিদ্যায়তনিক সাহিত্যালোচনা নয়, বিদ্বদগোষ্ঠী অনুমোদিতও নয়। কিন্তু সরদার জয়েনউদ্দীনের যে সাহিত্যকৃতির সঙ্গে আমাদের পরম আত্মীয়তা, সেখানে সেই শিল্পবাস্তবে সবই রহস্যময়। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বা ডিটেলসের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি, বরং প্রতিক্ষেত্রে সচেতন নিমগ্নতা তাঁকে বাস্তব পরিপ্রেক্ষেতের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে প্ররোচিত করে। এই বিশ্বস্ততা দেখি ইতিহাসের প্রতি, মানুষের প্রতি, দেশমাতৃকার প্রতি এবং স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রতি। আখ্যানে যেস্থানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, তাতে আমরা দেখি একটি জনপদ, একটি জনগোষ্ঠী, জনপথের অতীত-বর্তমান, সেইসঙ্গে ভবিষ্যৎ-অতীতের হাড়গোড়ের স্তূপ থেকে নড়েচড়ে ওঠে আরেকবার, একটি অমরণশীল জীবনযাপন।

আরও পড়ুন সরদার জয়েনউদ্দীন-

১ম পর্ব

২য় পর্ব

৩য় পর্ব

৪র্থ পর্ব

৫ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

সরদার জয়েনউদ্দীন (৬ষ্ঠ পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!