সরদার-জয়েনউদ্দীন-৫ম-পর্ব
বই পর্যালোচনা,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

সরদার জয়েনউদ্দীন (৫ম পর্ব)

সরদার জয়েনউদ্দীন (৫ম পর্ব)

 

সাহিত্য মূল্যায়ন:

কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ান ঢুলী’। নয়ান ঢুলী গল্পগ্রন্থের কাজী মাস্টার, সবজানের সংসার, নয়ান ঢুলী গল্প পর্যালোচনা-

কাজী মাস্টার

‘কাজী মাস্টার’ গল্পে আমানত কাজী মাস্টারের চরিত্রটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। যে কিনা ১৯২১ সালে বিএ পাশ করেও শহরে গিয়ে হাকিম-উকিল না হয়ে হয়েছে স্কুলের মাস্টার। দেশের মানুষকে, গাঁয়ের মানুষকে শিক্ষার আলো দেবে। যার এমন আকাঙ্ক্ষা, তাকে শেষাবধি একটা স্কুলের জন্য নতুন করে আবার তৈরি হতে হয়। নিজের উৎপাদিত কফি বিক্রি করে পাঠশালার ঘর তুলবে, লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষকে নতুন করে বাঁচাবে। সে পরাণের মেয়ে ময়নাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিল। শহরে গিয়ে বৃত্তি দেবে, কত নাম হবে দেশজোড়া। কিন্তু গ্রাম সমাজের গণি মল প্রধান তা চায় না। কারণ তার নজর পড়েছে ময়নার ওপর। বুড়ো কিনা ময়নাকে বিয়ে করতে চায়, ঘটক পাঠায়। আমানত মাস্টার প্রতিবাদ করায় নতুন যুগের বে-শরিয়তি বলে ময়নার পড়া বন্ধ করে গ্রামপ্রধান গণি। স্কুল ভেঙে ফেলার হুকুম দেয়।

আরও পড়ুন পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রিভিউ

বসারত আর দেরাজ মোল্লা সে-রাতে মাস্টারের চোখের সামনে পাঠশালার চালা কেটে ফেলে। শুধু তাই নয়, পরাণের জমিটুকু একে-একে চলে যায় গণির জরিপ করা টাকা-খাওয়া আমিনের হাত দিয়ে। এভাবেই সমাজের একশ্রেণির মানুষ নিজেদের ক্ষমতা প্রকাশ করে। বিচারের বাণী নীরবে কেঁদে মরে। আর কেঁদে মরে মনুষ্যত্ব। ধর্ম দিয়ে মানুষকে কব্জা করতে না পারলে যে-অত্যাচার তার জন্য নির্ধারিত হয়, গাল্পিকতার রূপ যে এভাবে গল্পাকারে তুলে ধরবেন, তা সত্যিই অভিনব। গল্পে গ্রামীণ মানুষের কষ্ট-যন্ত্রণার সঙ্গে ভালো মানুষের পাশাপাশি নষ্ট-ভ্রষ্ট এক শ্রেণির চরিত্রটি বেশ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যার ভেতর কুরআন-হাদিসের জ্ঞান না থাকলেও উল্টাপাল্টা বিধান দিতে এতটুকু কার্পণ্য  করে না। জোতদার শ্রেণি আমাদের সমাজদেহকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তার চালচিত্র গল্পে দেখতে পাওয়া যায় আগাগোড়া।

সবজানের সংসার

প্রেসিডেন্ট সবজানকে বাঁধা মাগি হিসেবে রেখেছে। ‘সবজানের সংসার’ গল্পটি এভাবেই শেষ হয়। কেতাবদি জেল থেকে ফিরে দেখে বাড়ি ঘরের শ্রীবৃদ্ধি। দিনকাল ফিরেছে। তাহলে দুঃখ-দুর্দশা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বাঁচতে-বাঁচতে মানুষ একটা সময় কূল-কিনারা পেয়ে যায়। একটা আশা এবং স্বপ্ন যখন সত্য-সত্যি মুছে যায়, তখন সে কী নিয়ে বাঁচে? হিতাহিত-জ্ঞান হারিয়ে কোনো একটা খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকতে চায়। কেতাবদিকে মিথ্যে চুরির অপরাধে জেলে ছয় মাস থাকতে হয়। প্রেসিডেন্ট যতই যাকাত দিক বা দান-খয়রাত করেন না কেন, সে মূলত সর্বনাশা বদমায়েশের চূড়ান্ত। সবজানকে সে নিজের করে পেতে চায় এবং তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ক্ষেতের সেরা কামলা কেতাবদিকে কিল-লাথি, চড়-ঘুষি মারলেও কথা ছিল, চুরির অপরাধ দিয়ে দারোগা ডেকে ধরিয়ে দেয়। সামন্ত-মহাসামন্তরা যেভাবে মানুষকে চুষে খায়, শুষে খায় রক্তচোষার মতো, সেভাবেই সাম্রাজ্যবাদ নিষ্পেষিত করে এবং সেখান থেকে পরিত্রাণের কোনো রাস্তা নেই। গ্রাম্য অর্থনীতি একশ্রেণির হাতে মজুদ। তারাই নিয়ন্ত্রণ করে সমাজের আর দশজনের ভাগ্যকে। শ্রেণিহীন মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে উপর্যুপরি নির্যাতন করে মানসিক-শারীরিকভাবে এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিকভাবে।

নয়ান ঢুলী

‘নয়ান ঢুলী’ গল্পের প্রধান চরিত্র নয়ান। সে ঢোল মেরামতের কাজ করে জীবিকা চালায়। তার এ-পেশায় দিনদিন রোজগারপাতি কমে আসছে। কারণ আগে হাতে খুব কাজ আসত। বারোয়ারি মন্দিরের কাজ, চৈত্রসংক্রামিত্মর কাজ, গাঁয়ের যাত্রা পার্টির কাজ। তাছাড়া ভাসান-গাজির গান, তিননাথের মেলা, রামনামের আসর থেকেও তার ডাক আসত। ঢোল মেরামতের বায়না, দিনদিন সব কেমন হয়ে গেল। পরিবর্তন হলে একশ্রেণির মানুষের পেটে যে টান পড়ে তার একটা ইঙ্গিত স্পষ্ট দেখা যায়। তাই আজকাল কাজ পেলে নয়ানের মন ভরে। হাতে যেন সোনার তাল পায়। চোখে অনেক স্বপ্ন গিজগিজ করে। দুঃখ-সুখের দিনগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে। হতভাগ্য একজন মানুষের জীবনের কাহিনি গাল্পিক অত্যন্ত দরদের সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। দারিদ্র্য মানুষকে কুরে-কুরে নিঃশেষ করে।

আজ নয়ানের ঘরবাড়ি মানে ওই জড়াজীর্ণ ঝুপড়ি, সাথি-সঙ্গী সব মরে গেছে। শুধু ওই ছাগল টেপীকে নিয়েই সংসার! বারান্দায় বসে হুককুর-হুককুর কাশে আর কাজকর্ম দেখে। ওর এককালের সাগরেদ পচাই। তার দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনায়। নয়ানের স্বতন্ত্র একটা জীবন ছিল। মানুষের বাড়িঘর নির্মাণ ওর পৈতৃক পেশা। নয়ান ঘরামির ডাকনাম ছিল দেশগাঁয়ে। একবার হারান পরামানিকের বাড়িতে কাজ করে চারদিন; কিন্তু টাকা দিতে চায় না। বলে, টাকা নাই, কাল নিও… নয়ান জানায়, বাড়িতে চাল নাই, তবু হারান নাছোরবান্দা ফিরিয়ে দেয়। ঘরে মেয়ে জরিপোশ ক্ষুধায় কাতর, ওর মা জ্বরে অজ্ঞান। ঘরে চাল নেই, বার্লি নেই, ডাক্তারও পয়সার অভাবে আসে না। দিশেহারা নয়ান শীতেলের কাছে যায়। জেলের ঘুঘু শীতেল চোর, গরিবের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। সিঁদকাটা চোর হলেও মানুষের কষ্ট বুঝত। নয়ানের কথা শুনে শীতেল বলল, কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকার জায়গাটা শুধু দেখিয়ে দিবি। সে-রাত্রে দুজনে হারানের বাড়ি চুরি করে। সকালে ডাক্তারের কাছে ফিসের টাকা নিয়ে গেলে ধরিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন পাবনা জেলার গ্রাম-মহল্লার নামকরণের ইতিহাস রিভিউ

সারা গাঁয়ে হুলস্থুল কান্ড! বিচারে দুজনের ছয়-ছয় মাসের জেল হয়। জেল থেকে বের হয়ে জরিপোশ আর ওর মাকে দেখতে পায়নি নয়ান। মরে গেছে না-খেতে পেয়ে। সেই থেকে পিতৃপুরুষের পেশা ছেড়ে নয়ান ঘরামি হয়ে যায় নয়ান ঢুলী। কথা বলতে-বলতে চোখ ফেটে পানি ঝরে। সাগরেদ পচাই বলে, কাঁদলে হবে না, চলো আবার শিকারে। আমি নিজের হাতে করব। তুমি উঠে দাঁড়াও নইলে যে আমরা বাঁচব না। গল্পের শেষে দেখা যায়, শেষরাত্রের দিকে পচাই আসে নয়ানের বাড়ি। ঘন অন্ধকারে দুজন এগিয়ে যায় সামনে। আঁধারের গভীরতা ভয় জমিয়ে তোলে মানুষের মনে, তবু ওরা আঁধার ভেদ করে যেতে থাকে। আঁধারের চেয়ে ক্ষুধা বড় মারাত্মক। দারিদ্র্য মানুষকে ভীরু করলেও উদ্যমী ও সাহসী করে তোলে কখনো। নয়ান ঢুলী সেই পিতা, যে তার মেয়ে জরিপোশকে ক্ষুধার অন্ন দিতে পারেনি। বউকে ওষুধ-পথ্য দিতে পারেনি, টাকার অভাবে বাড়িতে ডাক্তার আসেনি।

মানুষের প্রতি মানুষের এই নির্মমতা-পৈশাচিকতা সাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীন সহজ-সরল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। মাটি-মানুষের এই মেলবন্ধন গল্পটিকে একটা যোগ্য আসনে উপনীত করেছে বলতে দ্বিধা নেই।

আরও পড়ুন সরদার জয়েনউদ্দীন-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সরদার জয়েনউদ্দীন (৫ম পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!