সরদার-জয়েনউদ্দীন-৪র্থ-পর্ব
কামারহাট,  নাজিরগঞ্জ,  বই পর্যালোচনা,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

সরদার জয়েনউদ্দীন (৪র্থ পর্ব)

সরদার জয়েনউদ্দীন (৪র্থ পর্ব)

 

সাহিত্য মূল্যায়ন:

কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ান ঢুলী’ নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বাংলা সাহিত্যের কতটা শিখরে উঠেছিলেন, যদিও তাঁকে নিয়ে সেভাবে প্রায় আলোকপাত করা হয় না। নয়ান ঢুলী গল্পগ্রন্থের করালী, ভাবী গল্প পর্যালোচনা-

করালী

করালী চিরদিনের মতো জামেলাকে হারাল। এভাবেই সরদার জয়েনউদ্দীন ‘করালী’ গল্পের পরিণতি দেখিয়েছেন। জমিদার-সামন্ত বাবুরা কীভাবে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করেছে এবং ঘরের ইজ্জত নিয়ে বেইজ্জত করেছে তার একটা ছবি এই গল্পে চিত্রায়িত হয়েছে। ঘরে বউ নিয়ে শুয়ে ছিল কিন্তু হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে জামেলা হাওয়া। কোথায় গেল, বুঝে উঠতে পারে না। দৌড়ে যায় কাছারিতে, তাও পায় না। লোকজন উত্তেজিত হয়। জমিদারের বিরুদ্ধে কথা ওঠে–খাজনা নিচ্ছে আবার ঘরের বউকেও ছিনিয়ে নেয়। সবাই বলে, সদরে গিয়ে মামলা ঠুকে দিতে; কিন্তু মন তার বোঝে না। ইচ্ছে করছিল খুব করে কাঁদে; কাঁদলে বোধহয় দুঃখ কিছু কমে। করালী পেয়াদা কী করবে ভেবে যখন দিশেহারা, তখন মানিক বিশ্বাস ধমক দিয়ে ওঠে। সোজা কোটে যাও। তোর সাথে গাঁয়ের-দেশের মান-সম্মান জাত যায়। ভালো চাস তো আজই সদরে যা। থানায় গিয়ে কাজ নাই, ওসব দারোগা-ফারোগায় বিশ্বাস নাই, শালারা ঘুষের বাচ্চা। সোজা সদর, পুলিশ সা’ব কি ম্যাস্টের কোট। ঘরের বউ পরের সাথে ভেগেছে, শরম-লজ্জায় কাঁচুমাচু করে করালী।

আরও পড়ুন চকখড়ি উপন্যাস রিভিউ

আকস্মাৎ বৈঠকখানার কোনা থেকে নব্বই বছরের বুড়ো উজির সরদার–এককালের নামকরা লেঠেল, চাপাস্বরে ফিসফিসিয়ে বলে, জমিদারের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করবার দরকার নাই। সবাই মিলে হুজুরের হাতে-পায়ে ধরে ঘরের বউকে ঘরে নিয়ে আসো। হাজার হলেও জমিদার মুনিব। তারপর স্মৃতি হাতড়ে পেছনের গল্প বলে, খোনকারের ছেলের, হুজুরের এবং গহের সরদারের… মানিক প্রতিবাদ করে। সেকাল নাই চাচা, জমিদারের বিষদাঁত ভেঙে দেবো। শালার জমিদার… বংশ নিপাত না করে ছাড়ছি না; কিন্তু করালী ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাতপাঁচ ভেবে ঘুরে বসে। মামলা-মকদ্দমা বড় খারাপ জিনিস, ওপথে অনেক হাঙ্গামা। উজির দরদারই ঠিক কথা বলেছে, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে পেরে ওঠা যায় না। করালী মনস্থির করে, সত্যিই হয়তো তাই। সামন্তরাজ সর্বত্র গ্রাস করছে, বেঁচে থাকা কঠিন। শেষে তার পেয়াদাগিরি চাকুরি চলে যাবে। হাজার ভেবে করালী জমিদার বাড়িই রওয়ানা হলো। এভাবেই মানুষ হয়তো ক্ষমতার কাছে, শক্তির কাছে মাথা নত করে এবং করতেই হয় জীবনযাপনের কারণে।

ভাবী

ভালোবাসা যে সত্যিই ভাগ করে দেওয়া যায় না, ‘ভাবী’ গল্পে সোহাগী সে-কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কৃপণ নেজামদ্দি সরকার মরে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরে তার বড় ছেলে নেয়াজ মহাম্মদ, ছোট ছেলে নবীবক্স নবম শ্রেণিতে পড়ে। নেয়াজ জমিজিরাত নিয়ে দিনমান মেতে থাকে, আর নবীবক্স শুধুমাত্র ভাবিকে নিয়ে দিনরাত্রি শেষ করে। সংসারের দিকে বিন্দুমাত্র তার খেয়াল নেই। শহরে গিয়ে সিনেমা দেখা, ভাবির জন্য চুড়ি-ফিতে-শাড়ি কিনে আনা যেন নবীর কাজ হয়ে দাঁড়ায়, যদিও সেসব পয়সা সোহাগীই দিত স্বামীর কাছ থেকে চেয়ে। একপর্যায়ে যে সোহাগী একটু-একটু করে নবীবক্সের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তা নিজেই টের পায়। তখন নিজেকে শক্ত করে বাঁধে; কিন্তু দেখা যায়, তা বাঁধতে গিয়ে সোহাগী নিজেই হারিয়ে ফেলে নিজেকে। নবীর বিয়ে দিতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে টের পায় যে, সত্যি-সত্যিই নবীকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে। সেই ভালোবাসা হয়তো শারীরিক নয়, তারপরও মানসিক এক সম্পর্কের দোলাচলে গল্পটি এগিয়ে যায় অনেকটা দূর।

আরও পড়ুন গল্পগ্রন্থ মায়াকুসুম রিভিউ

নবীবক্স বিয়ের দিন সালাম করতে গিয়ে দেখে ভাবির সেই চেহারা আর নেই। মুখখানা শুকিয়ে আধখানা হয়েছে। বুক ভেঙে যায়, কী দেখছে সে! সোহাগী টাল খেয়ে পড়ে। কাঁদতে থাকে আর মনে-মনে ভাবে পুরুষ জাতটার পরাণ বলে কিছু নাই, বড় বে-রহম! মনস্তাত্ত্বিক এ-গল্পে জীবন যেন অন্যভাবে ধরা দিয়েছে। ভালোবাসা যে কতটা সূক্ষ্ম অনুভূতি, তা একবাক্যে বোঝানো সম্ভব নয়; ভালোবাসার স্পর্শ দিয়েই বোঝাতে হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক বা স্টাইল গল্পে ধরা পড়েছে। 

আরও পড়ুন সরদার জয়েনউদ্দীন-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৫ম পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সরদার জয়েনউদ্দীন (৪র্থ পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!