সরদার-জয়েনউদ্দীন-২য়-পর্ব
কামারহাট,  নাজিরগঞ্জ,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

সরদার জয়েনউদ্দীন (২য় পর্ব)

সরদার জয়েনউদ্দীন (২য় পর্ব)

সাহিত্য কর্ম: জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি সরদার জয়েনউদ্দীন স্বীয় জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিচিত্র প্রেক্ষাপটে। কখনো আনন্দে, কখনো বেদনায়, কখনো অপমান, উপেক্ষায়, আবার কখনো সম্মানের বরমাল্যে। গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি, তাই গ্রামের মানুষকে নিয়ে রচিত তাঁর গল্প-উপন্যাস পাঠক হৃদয়কে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে। এ কারণেই পঞ্চাশ দশকে রচিত গ্রামীণ ক্যানভাসে চিত্রিত তাঁর গল্পগুচ্ছ বিপুলভাবে পাঠকনন্দিত। চেনা চরিত্র এবং চেনা কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তাঁর অসাধারণ গল্প সম্ভার। অতি সাধারণ, অতি তুচ্ছ, অতি ক্ষুদ্র অবহেলিত গ্রামের জনমানুষ তাঁর অধিকাংশ গল্পের কুশীলব। তিনি যাদের অন্তরঙ্গ আলোকে দেখেছেন, যাদের নিবিড়ভাবে চিনেছেন, কথাশিল্পে সেসব চরিত্র নিয়ে তাঁর কায়কারবার। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা সুনিপুণভাবে বিধৃত হয়েছে তাঁর লেখনীতে। বাংলা সাহিত্যে  বিশিষ্ট কথাশিল্পী হিসেবে তিনি সুপরিচিত। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। 

সরদার-জয়েনউদ্দীন
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় সঙ্গীত সম্মেলনে আগত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সঙ্গে (বাম থেকে) বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে শিল্পী কামরুল হাসান, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দিন প্রমুখ

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ নয়ান ঢুলী প্রকাশ হয়। এতে তিনি সমকালীন সামাজিক সংকট, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, গ্রামের অবহেলিত মানুষের সুখ-দুঃখের চিত্র, জমিদার-জোতদারদের শোষণ-নিপীড়ন তুলে ধরেছেন। গল্পগ্রন্থটি তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। 

তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস ‘নীল রং রক্ত’ ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ হয়। উপন্যাসটিতে সুনিপুণভাবে বিধৃত হয়েছে পাবনার নীলচাষি ও দেশীয় অত্যাচারী ভূস্বামীদের দ্বন্দ ও সংঘাতের কাহিনী। ইতিহাস নির্ভর এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন বলা যেতে পারে।

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ  হয় উপন্যাস আদিগন্ত। এ উপন্যাসে তিনি  তুলে ধরেছেন তৎকালীন হিন্দুসমাজের দুরবস্থার কথা।

আরও পড়ুন কবি, ঔপন্যাসিক ও সম্পাদক আনন্দ বাগচী

শুধু গ্রাম বাংলা নয়, শহর জীবনও তাঁর কাহিনীতে প্রাণময় হয়ে উঠেছে বিচিত্র্য পটভূমিকায়। ইতিহাস নির্ভর সামাজিক উপন্যাস ‘অনেক সূর্যের আশা’ এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর রচনায় গণমানুষের কল্যাণ ও মুক্তিচিন্তার পাশাপাশি সমকালীন সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক ঘটনাবলিও প্রাধান্য পেয়েছে। অনেক সূর্যের আশা উপন্যাস তাঁকে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। অনেক সূর্যের আশা উপন্যাসের পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কবি রহমতের স্মৃতিকথায় দেশবিভাগ ও তারপর বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি চিত্রায়িত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে দেশবিভাগের পর বাংলার বাঙালি মুসলমানেরা তাদের স্বপ্ন ও আবেগ থেকে বারবার বিচ্যুত হয়েছে।

উপন্যাস ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত। 

নগরীর সুরম্য অট্টালিকার পাশে অগণিত বস্তিবাসী মানুষের জীবন ও জীবিকার এক চমকপ্রদ আলেখ্য তাঁর রচিত সর্বশেষ উপন্যাস ‘কদম আলিদের বাড়ী’। এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় বহুল প্রচারিত একটি সাপ্তাহিকীতে। তাঁর এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাসটিতে খেটে খাওয়া মানুষের এক অনুপম চিত্র অঙ্কিত হয়েছে । 

সরদার মূলত কথাশিল্পী হলেও সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গন তাঁর পদচারণায় মুখরিত হয়েছে। কবিতা, ছড়া এবং কিশোর সাহিত্যে তাঁর অবদান অনুল্লেখ্য নয়। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তাঁর ‘উল্টো রাজার দেশ’ এবং ‘অবাক অভিযান’ বই দুটি রচিত হয়েছে রূপকথার কাহিনীকে উপজীব্য করে। ‘টুকুর ভূগোল পাঠ’ এবং ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’ দুটি বই-ই শ্রেষ্ঠ কিশোর সাহিত্য হিসাবে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’ কিশোর উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট আমাদের দেশবাসীর মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার অলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে মূর্ত হয়ে উঠেছে একাত্তরের সেই রক্তরাঙ্গা দিনগুলো।

আরও পড়ুন  সরদার জয়েনউদ্দীন
১ম পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সরদার জয়েনউদ্দীন (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!