পরনারী
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

পরনারী

পরনারী

শফিক নহোর

 

পরিবর্তনশীল সম্পর্কের ভেতরেও মনে হয় আরও একটি সম্পর্ক থাকে ।

পাশের বাসার তুলি ভাবি, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে,

──‘ভাই আজ আপনার অফিস নেই?’

মুখে তখন আমি শেভিং ক্রিম লাগিয়ে রেজার দিয়ে এক টান দিয়েছে মুখের বাম পাশে।ওয়ালের গ্লাসে তার চেহারা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে । ঠোঁটের কোণায় ‘না’ শব্দটি মোবাইল নেটওয়ার্কের মত আপ-ডাউন করছিল।

বলবো না ভাবি,আজ অফিস নেই। ভেতরে আসুন বাহিরে দাঁড়িয়ে কেন?’

‘কিছু বলবেন কি?’

আমার কণ্ঠের শব্দ পেয়ে বেডরুম থেকে আজরাইল রূপে আমার বউ প্রভা বের হয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

──ভাবি আপনি, কখন এলেন। কিছু বলবেন কি?’

──না তেমন কিছুই না।

‘আপনার ভাই বাসায় নেই, আমার দেবর … কথা শেষ না হতেই প্রভা সন্দেহ স্বরে বলল,

──তুলি ভাবি কী বলছেন, আস্তে বলুন, দেখছেন না রাসেল শেভ হচ্ছে ।’

আমি পুনরায় মুখে আবার শেভিং ক্রিম লাগিয়ে একটু ভাবে ভাবে শেভ হচ্ছি । ভদ্রতার খাতিরে গ্লাসের ফাঁকে তাকিয়ে পুনরায় বললাম ।

──ভেতরে আসুন, ভাবি দাঁড়িয়ে কথা বলবেন তাই।

──না এখন না, পরে আসব ভাই।

তুলি ভাবি কী যেন ফিস্ ফিস্ করে বলে দ্রুত চলে গেল।

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

আমার দাড়ি শেভ শেষ । আফটার লোশন লাগিয়ে বেডরুমে ঢুকতেই প্রভার আচরণ কুটিল এক রূপ ধারণ করল। মনে হল প্রভা আমার অপরিচিত কেউ । মুখের দিকে তাকিয়ে চোনার উপায় নেই পেত্নীর মতো লাগছে দেখতে। ভেতরের কালো রূপ চেহারায় ভেসে উঠেছে;

──ঐ মহিলা তোমার কাছে আসছে কেন?’

──’কোন মহিলা?’

──কোন মহিলা মানে? তুমি কী চোখে কাঠের চশমা লাগিয়ে দাড়ি শেভ করছ এতক্ষণ।তারে তুমি দেখ নাই। ন্যাকামি বাদ দিয়ে বল কেন, এসেছিল?’

──তুমি সহজ বিষয়টা এত কঠিন করছো কেন?’

──তুলি ভাবির সঙ্গে তো তোমার পরিচয় খায়খাতির সেই হিসাবে আমি দেখা হলে সৌজন্যতা মূলক আলাপ-আলোচনা করি,তার মানে এই নয় তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। গোপনে প্রেম করি ।

──শুনলে না, তুলি ভাবি কী বিশ্রী ভাষায় তার স্বামী সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করল; অন্য মানুষের কাছে কী তাই মানুষ এভাবে বলে,

ছিঃ ভাবতেই খারাপ লাগছে।

──আমি বাহিরে যাব। লেট হয়ে যাচ্ছে;তুমি নাশতা দাও।

──তুলি ভাবি কথা বলতে বসলে তো, এক ঘণ্টা লেগে যেতো । আর এখন দুই মিনিট সহ্য হচ্ছে না তোমার।

──সাতসকালে তোমার সঙ্গে ছোট্ট বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হোক সেটা আমি চাই না প্রভা।

── তোমাকে বলে দিচ্ছি আদিখ্যেতা করবা না আমার সঙ্গে।

নাশতা সেরে সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তুলি ভাবি উপড়ে উঠছে ,

──আরে ভাবি, আবার দেখা হয়ে গেল।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

কোথায় যান?’

──আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম।

──কেন বলুন তো, সকালে একবার বাসায় গিয়েছিলেন। কিছু না বলে চলে আসলেন।

আমি প্রশ্ন করবার পর হাওয়া বিহীন বেলুনের মতো হয়ে গেল তুলি ভাবি ।

সিঁড়ি দিয়ে আমার সঙ্গে নেমে আসছে; পেছনে প্রভা আমাদের দুজনের কথা শোনবার চেষ্টা করছিল।

রুমের সামনে যেতেই তুলি ভাবি আমার হাত স্পর্শ করল, আমি একটু অন্য মনস্ক হয়ে গেলাম।

হঠাৎ আমার ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম; প্রভার ফোন রিসিভ না করে রেখে দিলাম।

──জি ভাবি কী যেন বলতে চেয়েছেন; এবার বলুন,

──ও হ্যাঁ,

আমার দেবর রানা, সৌদি আরব থাকে স্কাইপি না ফেসবুকে কথা বলবে, আমাদের পিসিতে আপনার ভাই মডেম ব্যবহার করতে পারছে না।তাই আপনি যদি সেটিংসটা একটু দেখিয়ে দিতেন।

──ও আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নেই। আমি সন্ধ্যায় যখন ফিরে আসব তখন দেখিয়ে দেবো। অফিসে একটু তাড়া আছে আজ।

আরও পড়ুন গল্প পরাজিত নাবিক

প্রভা শিক্ষিত-মার্জিত ভদ্র কিন্তু এই দেড় বছরে প্রভার অনেক পরিবর্তন এ পরিবর্তনের বিশেষ একটি কারণ আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে একাকীত্ব! করোনাকালীন সময়ে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। অফিসে ছয় ছয়জনের পরিবর্তনে তিনজন দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। আবার শুরু হল করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। অফিসে আমি নিজেও ব্যস্ত অফিসের কাজের চাপে ঠিকঠাক খবর নেওয়া হয়ে ওঠে না প্রভার। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও একাকিত্ব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে প্রভা এবং তার একটি প্রভাব পড়েছিল সেটা তার বিভিন্ন আচরণে দৃশ্যমান হয় কারণে অকারণে ।

কথা বললে অল্পতে রেগে উঠবে, অযাচিত সন্দেহ করবে।

রাতে অফিস থেকে ফেরার সময় তুলি ভাবির বাসায় নক করতেই প্রভা দরজা খুলে দিল।’

কোনো কথা বলার আগেই প্রভা সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠে গেল। চোখের কোণায় শিশির বিন্দুর মতো জল চি্কচি্ক করছিল। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। রুমে না গিয়ে সোজা ছাদে উঠে পড়েছে ।আকাশে আজ তারার মেলা চকচকে জোছনা মৃদু বাতাস প্রভার চুল গুলো বাতাসে উড়ছে; শরীর ঘেঁষে দাঁড়ালাম শরীর দিয়ে কাঁচা আমের ঘ্রাণ বের হচ্ছে।

ঘাড়ের কাছাকাছি হাত রাখতেই নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নিল।

আমি খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম,

এত পাশাপাশি থাকি তবুও মনে হচ্ছে আমরা কত দূরবর্তী বাসিন্দা।

প্রভার মনের ভেতরে ঢুকে গেছে সন্দেহ সে আর আমাকে বিশ্বাস করবে না। এখন নিজেকে সাধু প্রমাণ করতে গেলে চরিত্রহীন হয়ে উঠতে হবে । তার চেয়ে প্রভার সঙ্গে এ বিষয় আলোচনা না করলেই বরং মঙ্গলময় হবে।

আরও পড়ুন গল্প  তৃতীয় স্বাক্ষী

আমি ছাদ থেকে পালাতক শিশুর মতো নিচে নেমে এলাম সে রাতে। ঘরের ভেতর আলো তবুও মনে হচ্ছে আলোর স্বল্পতা ঘরটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে ।

আমি ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলিয়ে খাটের পাশে বসে রইলাম তখন প্রভা ঘরে ঢুকল । মুখের দিকে তাকাতেই বিষণ্নতা তাকে গ্রাস করেছে; পাশে বসবার জন্য তাকে ইশারা করলাম । আমার সঙ্গে কথা না বলেই আমার পায়ের কাছে বসে কান্না করতে লাগল। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আমার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। দুজনের চোখের জল আজ অভিমানের অবিশ্বাসের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল অতল গহিনে ।

গতমাসে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল প্রভার সে ওষুধ গুলো নিয়মিত খায়নি । কেন খায়নি? তা প্রশ্ন করতেই বলে উঠল,

── আমার জন্য মায়া কান্না দেখাতে হবে না। আমি জানি তুমি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না । এভাবে আমি আর সংসার করতে পারব না। আমাকে তুমি ডিভোর্স দিয়ে দাও ।

── আমি সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত ছিলাম না । প্রভা এমন প্রশ্ন বানে আমাকে জর্জরিত করবে ।

অপরাধ-বোধের দিকে তাকালে নিজের কাছে মনে হয় কী এমন অপরাধ করলাম সে আজ আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে ।

─এমন করছো কেন?

─ আমি তোমার সঙ্গে এই বাসায় থাকব না । আমাকে তুমি মুক্তি দাও প্লিজ!

── জানি এখন কথা বললে,তা আরো বিপদ ডেকে আনবে। আমি আবারও বিনয় ভাবে তাকে বললাম; আমার ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে আমাকে খেতে দাও।

── রান্না হয়নি।

── আমি রাতে কিছু খাবো না।

তুমি কিছু খেতে চাইলে নিচের হোটেল থেকে কিনে আনতে হবে ।

আরও পড়ুন রঙিন ঘুড়ি

আমি কাপড় পরে নিচে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম ।সিঁড়ি বেয়ে নামতেই তুলি ভাবির সঙ্গে আবার দেখা।আমি একটু ভয়ে পেছনে তাকালাম প্রভা আমাকে দেখছে কী না।আমি দ্রুত তুলি ভাবিকে প্রশ্ন করলাম।

── ভাবি আপনি আমাকে এতবার খুঁজছেন কেন? বুঝতে পারছেন না প্রভা আপনাকে সহ্য করতে পারে না । আমাদের মাঝে খুব সমস্যা হচ্ছে । আমার কথা শুনে তুলি ভাবি হেসে উঠল।আমি তাকে স্পর্শ করতেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল । মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে দেখলাম না কেউ নেই, তাহলে তুলি ভাবি!

আমার গলা শুকিয়ে আসল, দ্রুত নিচে নেমে দারোয়ান চাচাকে বললাম,

চাচা এক গ্লাস খাবার পানি দেবেন? হাতের কাছেই পেপসির বোতলে পানি ভরে রেখেছে, দুই ঢোক খেয়ে বের হলাম ।

রাতের খাবার নিয়ে ক্যাশ-কাউন্টারে টাকা জমা দিতেই তুলি ভাবির সঙ্গে আমার কাকতালীয় ভাবে দেখা ।

── তুলি ভাবি আপনি এখানে কি করেন?

তুলি ভাবি প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না । আমি আর একটু সামনে এগিয়ে আবার বললাম,

── ভাবি, কথা বলছেন না যে।

── কে আপনি? আর আমাকে আপনি ফলো করছেন কেন?’

──তুলি ভাবি আমি রাসেল । আমাকে চিনতে পারছেন না।

আসবার সময় তো দেখা হল। আপনি কি সত্যিই আমাকে চিনতে পারছেন না । পাশে থেকে একজন ভদ্রলোক তুলি ভাবির হাত ধরে বাহিরে চলে গেল।আমি আর প্রশ্ন করতে পারলাম না।

── মানুষটা পাগল না কি আমাকে বলছে, তুলি ভাবি।’

অথচ,

সে আমাকে দিয়ে দু’বছর আগে প্রভাকে খুন করিয়েছিল।’ আমি রাতের খাবার হাতে দাঁড়িয়ে থাকি প্রভা অথবা তুলি ভাবি আসবে । কেউ আসে না । একটি কুকুর আমার হাত থেকে খাবার ব্যাগটি ছিনিয়ে নেয় সেই রাতে।’

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

পরনারী

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!