জীবনের-উপহাস-৩
কবিতা,  গল্প,  রাতুল হাসান জয় (গল্প),  সাহিত্য

জীবনের উপহাস ২

জীবনের উপহাস ২

রাতুল হাসান জয় 

 

 

মাস্টারদা,

শান্ত দিন শেষ হলে যখন খুব-চেনা কোলে হেলান দিতে ইচ্ছে করে। তখন ঘরের সেই একটিমাত্র জানালার শার্সিতে গা এলিয়ে বসে ছাদে ওঠা চাঁদের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকি। যে সন্ধ্যায় অমাবস্যা কিংবা খুব মেঘ, সে আকাশে কল্পনার চাঁদ এঁকে নিই মনে-মনে। হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকেই ঘরের এই কোণটা ভীষণ সামলেছে আমায়— সামাজিক নিয়মের আপনজনেরা যখন পরমানুষদের থেকেও দূরের মনে হয়, তখন এই বোবা জানালা, ঘুলঘুলি দিয়ে দেখা-যায় অমন আকাশ আর ওই রোজকার রূপালী চাঁদের সাথেই রান্নাবাটি খেলি।

এসব কেন লিখছি? এগুলো কি ফোনে বলা যেত না? যেত বৈকি। আপনি তো আমার ফোন ধরবেন না। ধরলেও হারিয়ে যাবে আমার কথারা।
এই চিঠিটা থেকে যাবে জানি। আপনি আমার কোন চিঠিই ফেলে দেননি, হয়তো পড়েন নি কিন্তু যত্ন করে রেখেছেন। চোট খাওয়া মানুষগুলো আবেগ যত্ন করতে জানে। জানেন অনেকদিন চিঠি লিখিনি।
সেই যে আপনি গেলেন সেই শেষবার লিখছি। তারপর আজ।

একটা মানুষ চলে গেলে বুঝি এমন দমিয়ে দমিয়ে বুকে ব্যথা হয়, জমানো শখ আল্লাদগুলো এমন হঠাৎ করে মরে যায়?
এত ব্যথায় থাকলে কেউ কি করে শান্ত থাকতে পারে? নিস্তব্দ থাকতে পারে? পাবোনা জেনেও কি করে প্রতিক্ষায় থাকতে পারে?

কত স্বপ্ন ছিলো আমারো। বই পড়তে পড়তে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবেন। আমার হাতের বই সরিয়ে চোখে চুমু এঁকে দিবেন। আর আমি জড়িয়ে ধরে আপনার গাঁয়ের গন্ধ নেবো।

ভীষণ হাঁফিয়ে উঠেছি, চব্বিশ ঘন্টা ধোঁয়া ছাড়া ইট ভাটার চিমনির মত বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে। ভাবতে ভাবতে অনিদ্রায় দু’চোখের পাটাতনে ছোটো ছোটো কালশিটে দাগের গিরিখাত তৈরী হয়েছে। আমার এখন অনেকটা আদর দরকার। অনেকটা যত্ন দরকার। যত্ন পেলে মরুভূমিতেও তরতরে বেড়ে ওঠে রক্ত গোলাপ। আমার আপনাকে দরকার।
ভিতরে ভিতরে কেমন ভেঙে গেছি।
আপনি তো বাস্তবতার সূত্রে মন বেঁধে চলে গেলেন। কখনো বলেন নি আমায় ভালোবাসেন নি। আপনার পায়ে দায়িত্বের শিকল। দায়িত্ব কাঁধে থাকলেই কি মনের কথা শুনতে হয় না?
এখন মন খুলে কথা বলতে গেলেই ঢোঁকের সাথে আটকে যায় কথারা। নির্বাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকাই, জলের ফোঁটা পরে দু’গালের পাশ বেয়ে। কেন এমন কঠিন হয়ে যাচ্ছে জীবন, কেনোই বা আয়ত্তের বাইরে আজকাল আমার মন আমার থেকে বলতে পারবেন?

আপনি বলেছিলেন, “কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা একটু বেশিই আবেগী হয়। এদের সাথে কেউ মিষ্টি করে কথা বললেও তারা প্রেম মনে করে নেয়। একটু বেশি সময় যাকে কাছে পায় তাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।!”

আচ্ছা কলেজ শেষ হলেই ভুলে যায় কি? দুই বছর হলো কলেজ শেষের। ভুলতে পারিনা কেন?

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ঠিকানা পেয়েছি আপনার।
তাই লিখতে বসা। বাবা বিয়ে ঠিক করেছে। খুব তাড়াতাড়িই বিয়েটা হবে সম্ভবত। ছেলেদের খুব তাড়া বিয়ের পর ছেলের সাথে দেশের বাহিরে…

ভালো থাকবেন, দায়িত্ব দায়িত্ব করে নিজের স্বপ্নের তো মাটি দিলেনই। এবার প্রিয়তমার দায়িত্ব নিতেও শিখবেন একটু।

ইতি
আর্শি

 

 

আজ কেন যেন এতদিন পর চিঠিটা পড়ে ভেতরে ভেতরে একরকম মরে যাচ্ছি বোধহয়। বুকের ভেতরটা ভিজে উঠছে একদম। আমার হাত কাঁপছে। হাতে থাকা চিঠিটার ওপর কখন যে চোখ বেয়ে কিছু হাহাকার গড়িয়ে পড়ে ভিজে গেছে চিঠিটা, টেরই পাইনি। চাকরির বাজারের এই দূর্মূল্যের দিনে একটা বেসরকারি চাকরি জুটেছিল। কোম্পানির দূর্নীতির ফলে লসের খাতায় নাম লিখিয়ে কোম্পানি ছাটাই করে আমার কতো অনেক চাকুরের। এরপর সহজে চাকরি জোটে না। সরকারি চাকরি তো অমাবস্যার চাঁদ। বাধ্য হয়েই টিউশনি করাচ্ছি একটা, মেয়েটার নাম আয়েশা। সামনেই ইন্টার পরিক্ষা তার…

আর্শির মাস্টারদা আজ হঠাৎই চিঠির উত্তর লিখতে বসেছিলো। লিখেছিলো তার গোপন অনুভূতি। সকালের আলো ফুটতেই পুড়িয়ে দিয়েছে সে পত্র। কিছু অনুভূতি গোপন রাখতে হয়। কিছু অনুভূতি কাউকেই জানাতে হয়না।

 

আরও পড়ুন-

জীবনের উপহাস ১

জীবনের উপহাস ৩

 

 

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!