আজিম-উদ্দিন-চৌধুরী
দর্শনীয় স্থান,  দুলাই,  দুলাই (গ্রাম),  দুলাই ইউনিয়নের ইতিহাস ও ঐতিহ্য,  প্রাচীন নিদর্শন

জমিদার আজিম চৌধুরী (শেষ পর্ব)

জমিদার বাড়ি: আজিম উদ্দিন চৌধুরীর জমিদার বাড়িটির ধ্বংসাবশেষ কালের স্বাক্ষী হিসেবে এখনো দন্ডায়মান রয়েছে।

পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের দুলাই গ্রামে প্রায় ২৫০ বছর আগে এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ
আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ

জমিদার আজিম উদ্দিন চৌধুরীর নামে জমিদার বাড়িটির নাম হলেও এই জমিদার বাড়িটির মূল গোড়াপত্তনকারী হচ্ছেন জমিদার আজিম চৌধুরীর পিতা রহিমুদ্দিন চৌধুরী। তিনিই এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা। জমিদার বাড়িটি আজিম চৌধুরীর নামে হওয়ার কারণ হলো তিনি যখন এই জমিদার বাড়ির জমিদারি পান তখনই এই জমিদার বাড়িটি বিস্তার লাভ করে।

 

 

এই জমিদার বাড়িতে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মট, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকা, ০৫টি পুকুর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ১২০ বিঘা জমির তিন ভাগের এক ভাগ জুড়ে নির্মান করেছিলেন অত্যাধুনিক ডিজাইনের দ্বিতল বহুল দুয়ারি এবং বহু কক্ষের প্রাসাদতুল্য এই অট্টালিকা।

আজিম-চৌধুরীর-জমিদার-বাড়ি
        প্রবেশ পথ

১১টি নিরাপত্তা গেট বেষ্টিত এ অট্টালিকার মূল গেটে দন্ডায়মান থাকত বিশাল আকৃতির দুটি হাতি। হাতি দুটিকে জমিদার বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরীর কাজে ব্যবহার করা ছাড়াও আজিম চৌধুরীর ভ্রমণ বাহন হিসাবে ব্যবহার করা হত। মনোলভা সৌন্দর্য মোহিত বিলাসবহুল এ অট্টালিকার চারদিকে পরিবেষ্টিত ৬০ বিঘার একটি দর্শনীয় দীঘি। নিরাপত্তা বিধানে হাতি ছাড়াও ছিল দুটি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় কামান। বাড়ির অভ্যন্তরে একটি মসজিদ, জমিদার দরবারে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের গোসলের জন্য একটি বিশাল পুকুর এবং জমিদার পরিবারের বিবিদের গোসলের জন্য অন্দর মহলের ভিতরে খনন করা হয়েছিল আরো একটি দর্শনীয় পুকুর।

 

 

বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি প্রায় ধ্বংসের মুখে। যদিও তা বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির বংশধররা রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তা সরকারের অধীনস্ত হয়ে যায়।

আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ির মসজিদ
জমিদার বাড়ির মসজিদ

পরে এই জমিদার বাড়ির বংশধররা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জমিদার বাড়িটি ১৯৯৪ সালে ফিরে পান। তারপর থেকেই তারা এই জমিদার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন জমির উপযুক্ত মালিকানা না থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা বাড়ির প্রায় সবকিছুই লুট করে নিয়ে যায়। বর্তমানে এখানে আজিম চৌধুরীর দ্বিতল ভবনের কাঠামো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রায় ১০ হাজার একর সম্পত্তি দখল হয়ে গেছে।

 

 

আজিম চৌধুরীর বংশধর ফারুক হোসেন চৌধুরী জানান, দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ার পর বাড়িটি উদ্ধার করলেও তখন এর ধবংশাবশেষ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ঠ ছিলো না।

পুকুর পাড়
পুকুর পাড়

তবে এখনো প্রভাবশালীদের দখলে থাকা কয়েক হাজার বিঘা সম্পত্তি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফারুক হোসেন চৌধুরী জমিদারের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি সহযোগিতার জন্য অনেক দিন থেকেই অনুরোধ করে আসছে। তার অনুরোধে ২০১৭ সালে পাবনা জেলা প্রশাসক রেখা রানী বলেছিলেন, এ বাড়িসহ আজিম চৌধুরীর বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু আজ অব্দি এতেও কোন ধরনের ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়নি।

 

 

আজিম চৌধুরীর পঞ্চম উত্তরসূরি বিমান বাহিনীর সাবেক গ্রুপ ক্যাপ্টেন হাইবাত জান চৌধুরী জানান, আজিম চৌধুরীর এতবড় প্রাসাদ ধ্বংস হওয়ার পেছনে তার বংশধররাও কম দায়ী নয়। জমিদার প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পর তার বংশধররা গুপ্তধনের লোভে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে ফেলে।

দীঘি
দীঘি

চারতলা ভবনটির একতলা মাটির নিচে বসে গেছে। উপরের অংশও বিভিন্ন লতা, পরগাছা পেঁচিয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আজিম চৌধুরীর দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি দেখার জন্য ভিড় জমাত। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও পিকনিকে আসত। কিন্তু অযত্ন অবহেলায় আজ বাড়িটি ধ্বংস হতে চলেছে। তিনি আরও জানিয়েছেন সরকার যদি বাড়িটি প্রত্নতত্ত্বের স্বীকৃতি দিয়ে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলত তাহলে ঐতিহাসিক এ নিদর্শনটি ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে আরও যুগ যুগ ধরে টিকে থাকত।

 

 

যেভাবে যাওয়া যায়: পাবনা হতে ১৯ কি.মি. দূরে সিএনজি/বাস পরিবহন যোগে সুজানগর যাওয়া যায়। সুজানগর উপজেলা থেকে সিএনজি যোগে পোড়াডাঙ্গা বাজার হয়ে চিনাখড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে  দুলাই বাজারের ৫০০ মিটার দক্ষিণ দিকে রিক্সা/ভ্যান যোগে জমিদার বাড়ি যাওয়া যায়।

অথবা পাবনা শহর হতে বাস যোগে দুলাই বাজারে নেমে ভ্যান যোগে জমিদার বাড়ি যাওয়া যায়।

পড়ুন আজিম চৌধুরীকে নিয়ে লেখা-

১ম পর্ব

২য় পর্ব

 

তথ্যসূত্র: 

১। ইত্তেফাক 

২। নয়া দিগন্ত 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!