খোয়ার
গল্প,  শফিক নহোর (গল্প),  সাহিত্য

খোয়ার

খোয়ার
শফিক নহোর

 

পড়ন্ত বিকেলবেলা বাড়ি থেকে ফুটবল খেলার জন্য বের হচ্ছি। ঠিক সে সময় আকস্মিকভাবে আব্বা আমাকে পিছন থেকে ডাক দিয়ে বলল,
-খোকা, দেখত আমাদের ক্ষেতের আইলে কারো ছাগল বাঁধা আছে কি-না?
মানুষের হায়া দিন দিন উঠে যাচ্ছে। আমি বাড়ি থেকে চুন্নি বিড়ালের মত বের হলাম, স্কুল মাঠে ফুটবল খেলতে যাবার জন্য।
জমির আইল পাড় হয়ে মনের সুখে রহিম রূপবানের গান ধরলাম।
গ্রামের মানুষের তেমন কোন কাজকর্ম নেই, সারাদিন একজনের কথা অন্য জনের কাছে নিন্দা করা ছাড়া। হিন্দু পাড়ায় জমজমাট আড্ডা চলছে। নুদাই সরকারের বউকে ছোট্ট বেলায় বারান্দায় শুয়ায়ে রেখেছিল। তাকে শিয়াল কামড় দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পাশের জঙ্গলে। সেই পুরনো গল্প এখনো মানুষের মুখ-মুখে। বিভিন্ন ধাঁচের মানুষ বিকেলে বসে কত রকম গল্প করে, পোদ্দার বাড়ির শান বাঁধানো ঘাটে বসে।

অন্যের গাছের কাঁঠাল, ডাব, নারকেল, বেল, পুকুরের মাছ প্রভৃতি প্রামাণিক বাড়ির পোলাপান রাতের অন্ধকারে চুরি করে নিয়ে যেত। নিতাই কাকা ছিল এই গ্রামের সব চাইতে সহজ-সরল একটা মানুষ। তার দোহান থেকে রাত্রে চুরি কইরা পাট নিয়ে গেছে। পর মুখে শোনা কথা, তা বিক্রি কইরা দিছে হাকিম মহাজনের কাছে। ‘মানুষ চোর হলে মান ইজ্জত সব চলি যাবিনে, গ্রামে একটা অপায় উঠে গেল।’
সাদা কাপড়ে দাগ লাগে বেশি, তা মানুষের চোখে পড়ে সহজে। পদে পদে বিপদ! পাপের কাজ না করেই দোষ ঘাড়ে এসে পড়ল, এমন একটা ভাব ধরেছিল আরিফ। গ্রামের মানুষের ধারণা আরিফ ছাড়া আর কে এমন কাজ করতে পারে। আরিফ যতই বলুক আমি ভালো মানুষ।

আরও পড়ুন গল্প কবর

ছোটবেলায় জ্বীন পরীতে নিয়ে যেত আরিফকে। সে সময় থেকেই নাকি আরিফ প্রেমে পড়েছিল অন্য একটি মেয়ের। সেই মেয়ের জন্যই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত রাতের আঁধারে। বাড়ির লোকজন ভাবত ছেলেরে জ্বীন পরীতে আছর করছে। প্রেমিকার সঙ্গে দ্যে-হা করবির জন্যই ‘নিতাই কাহার’ বাড়ি থেকে পাট চুড়ি করেছিল আরিফ। এ কথা প্রমাণ করবার তখন কেউ ছিল না। শীতল ছিল নিতাই কাকার একমাত্র মেয়ে। যদিও তখন গ্রামে সবার মধ্যে মায়া মমতা ছিল। তবুও গোপনে কিছু দুষ্ট মানুষ ছিল ঠিক আরিফের মতো। আড়াল করে রাখত নিজের খারাপ কাজ। পৃথিবীর সব মানুষই পাপ করে নিজেকে নিষ্পাপ ভাবে।
শীতল কখনো কখনো ওদের পরিবারের কথা আমাকে বলতো। সত্যিকার অর্থে একটি অলিক অবহেলায় আমি শীতল থেকে দূরে সরে গেলাম।

“পোদ্দার বাড়ির জঙ্গলের ভেতর পাঁচ ছয় জন তাস খেলতো। সে রাস্তা দিয়েই নদী থেকে গোসল করে বাড়ি ফিরতো শীতল। তার দিকে এমন কইরা চাহে থাহে লোকজন। মনে হয়েছে ওখান থেকে এক টুকরা মাংস তুইল্লা কুত্তার লাহান খাবি। শয়তান বেটা মানুষ কোথাকার। বেশরম বজ্জাত।” শীতলের মুখ থেকে ফসকে গেল কথা। সেই কথার যাদু-বানে ডুব দিয়ে তলিয়ে গেল কালো অতীত।

পোদ্দার বাড়ি লিচু গাছ তলায় লিচু কুড়াইতে কুত্তার ঘেউ ঘেউ শুনে, নিজেই চইলা আসলিম। আহারে পোদ্দার বেট্যা এত ভালো মানুষ ছিলি। খুব সহজেই মইরা গেল। মানুষটা খুব আদর করত, ভালোবাসতো। মানুষটার জন্য আমার মায়া হয়। আমার সন্দেহ হয় কেউ তারে মাইরা ফেলছে। গাঙের জলে ভেসে গেছে তার চিতায় পোড়ানো শেষ চিহ্ন। এই সমাজে বেঁচে থাকতে হলে কৌশল করে বেঁচে থাকতে হয়। উপরে সবাই সাধু ভেতরে সদরঘাট।

আরও পড়ুন গল্প রঙিন ঘুড়ি

বাজান আমারে দেইখা আবার ডাকছে,
-দেখ তো আমাগো জমিতে কারও ছাগল লাগছে নাকি?
যাইয়ে দেখি দুইটা ছাগল বান্দা, ছাগল দুইডা আমি ইচ্ছা কইরে ছাইরা দিলাম। ছাইড়া দিয়া পাশের বাঁশ ঝড়ের কাছে আইসা গাব গাছ থেই-ক্যা দুইডা পাকা গাব দেখে গাছে উঠে ছিঁড়ে নিলাম। একটা পকেটে রাখলাম। একটা ভেঙে খেতে লাগলাম। আহা কী স্বাদ। তার কিছুক্ষণ পরে ছাগল ধরে নিয়ে চলে গেলাম। হাকিম কাকার খোয়ারে।
-কাকা তুমি কি আমার এক টাহার বেশি দিবালয়।
-বেটা রে একটাহা মেলা টাহা। এই টাহা দিয়ে কটকটি কিনে খাগে এখন।
-ও কাকী তুমি সাক্ষী থাইকো। কাকা আমারে একটাহা দেছে।
কাকী খিলখিল করে হাসে আর ছিঁড়ে যাওয়া ব্লাউজ শাড়ির আঁচল দিয়ে একহাত দিয়ে টেনে তুলছে। গরুর মত পান চিবাচ্ছে, আর দোকানে কি লাগবে তার তদারকি করছে। আমার থেকে এক খান কটকটি পাওয়ার আশায় সামনে হাত বাড়িয়ে দিল।

শীতল, আমারে অপমান করছিল আজ বুঝবো এর জ্বালা। ছাগল দুইডা ধইরা নিয়ে হাকিম কাকার খোয়ারে লটকায়া দিলাম। আমি নগদ পাইলাম একটাহা। কী যে আনন্দ লাগছিল, সেইদিন মনের মদ্দি। আট আনার কটকটি চাবাতি চাবাতি ফের চলে আসলাম ভুঁইয়ের আইল দিয়ে বাড়িতে।
তখন আমরা কামারহাট সরকারি স্কুলে পড়তাম। সেই স্মৃতি গুলো আজ তুলার-মতো বাতাসে ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।
শীতল, আমারে ডর দেখাইতো। হেডমাস্টার আমারে নাকি জোড়া বেত দিয়া পিটাইবো। আমি ম্যালাদিন হলো স্কুলে যাইনি। হেডমাস্টার দাঁড়া করে জোড়া বেত দিয়ে পিটাবে। বাবার নাম নাকি ভুলাইয়া দিবো। ‘আল্লাহ গো মাস্টার মানুষ মারবো কেন?’ আমি কি কোন অন্যায় করছি?’ স্কুলে যায়নি জামা ছিঁড়ে গেছে। সেলাই করতে দিছি যদু দর্জির কাছে দিচ্ছে না । তাই স্কুলে যাচ্ছি নে! মাস্টার আমাক মাড়লি পরে আর স্কুলে যাবো নানে।

আরও পড়ুন গল্প স্বর্ণলতা

ছাগল খোয়ারে দিয়া আসার পর সন্ধ্যার সময় শীতল, আমার সামনে কেমন কইরা কান্না করতে লাগল। তা দেখে পরাণডার ভিতরে খুব মায়া হুইল। আহা রে!
-এমন করে কাঁদিস কেন?’
-তুই আমার ছাগল খালি-খালি খোয়ারে দিচ্ছিস কেন?’ আমি আর তুই না একলগে খেলি। তুই না আমার বন্ধুর মত আমার জন্য তোর মায়া করে না?
-না, করে না।
-আমরা গরিব মানুষ টাহা পামু কই, তুই আমার ছাগল খোয়ার থেই-ক্যা আয়নে দে।
শীতলের চোখ ভিজে ওঠে, আমার প্রচণ্ড মায়া হয়। আমার কাছে চার আনা পয়সাও ছিল না সেদিন।

-আজ দু’দিন তুই আমার লগে দেখা করস নাই ক্যান? আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো- আমাগো জমির আইলে বাধা ছিল। আমি নিজেই খুলে দিছি আমাদের জমিতে লাগিয়ে দিছিলাম জিদ করে। আগে দেখা করলে কি তোর ছাগল আমি খোয়ারে দিতাম! তোর লাইগা আমার কেন জানি খুব মায়া হয় রে শীতল। চোখের দিকে তাকালে ভেসে ওঠে এক মায়াময় আবেদনের উঠোন। সবার চোখে সবাই চোখে-চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। সবার সেই সৎ সাহস থাকে না।

আরিফ শীতলের দিকে নজর দিতো। কু-দৃষ্টির কারণে যদিও  একটা সময় সমাজ, সংসার তাকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু টাকা ও দলীয় দাসের কাছে নিজেকে বিক্রি করে নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল গ্রামে। গণেশ কাহার ছাওয়াল, নরেন বাবু। সে শীতলকে কু-প্রস্তাব দিয়েছিলো। সে কথা কেউ কোনো দিন জানতে পারেনি। ধর্মর দোহাই দিয়ে বলেছিল-
-মানুষ জানলে তোকে খুন করে ফেলবি, খবরদার কাউকে কিছু বলিস না কিন্তু! বুজলু-রে গেদি।
-মানুষ জানলে ভগবান তোর পাপ দিবো। সেদিন কাউকে কিছুই বলে নি।

‘এই অসহায় গরিবের শরীর কেউ কেউ খুব সস্তা মনে করে।’ বিভিন্ন বয়সে মানুষ লোভে, অসহায় হয়ে যৌবন আসার আগেই দুষ্ট মানুষের হাতে হারিয়ে ফেলে জীবনের সব চেয়ে দামী সম্পদ।

আরও পড়ুন গল্প কথোপকথন

শীতল বড় হতে থাকে অভাবের সংসারে। লেখা পড়ার চাপ নেই। গ্রামে কোনো কোনো পরিবার মেয়ের বয়স হবার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়। মেয়ে মানেই তাদের কাছে একটা ঝামেলা। অথচ প্রতিনিয়ত স্বামী দ্বারা ঘায়েল হয়। বেদনার গোপন রহস্য থেকে যায় কয়লা পোড়া শরীরের গভীরে। শীতের সকালের শিশির বিন্দুর মতো স্বচ্ছ সে জলে ভেসে ওঠে প্রতারিত হবার চিহ্ন। পরিবারের মানুষ মনে-মনে ভেবে নেয়, মেয়ে সুখে সংসার করছে। শীতল ছিল ভিন্নতর ওদের পরিবার দরিদ্র হলেও লেখা পড়ায় খুব ভালো ছিল। প্রতিবাদী ছিল। কিন্তু সেই প্রতিবাদী মেয়েও হার মেনেছে দুষ্ট মানুষের কাছে।

কোনো বিচার নেই, লজ্জায় কারও কাছে কখনো বলেনি। ছোট কালে এসব কথা শুনলে, মানুষ সমাজে থাকতে দেবে না। প্রকৃতির আলো বাতাসে বড় হতে লাগল শীতল। আমাকে কি যেন বলতে চাইত। আমি ব্যস্ত থাকতাম ফুটবল খেলা নিয়ে। এক সময় আমি ঢাকা চলে আসি। পরে আর শীতলের সঙ্গে দেখা হয়নি।

সেই অভিমানে শীতল আমার সঙ্গে আর কখনো কথা বলেনি কস্মিনকালেও। জোয়ান হবার পরে মুখের দিকে চাইয়া থাহি চাঁদের লেহান দেখতি! অভিমানের পাল্লা ভারী হতে হতে স্মৃতি গুলো বিপক্ষে চলে গেছে। আমি শীতলের কাছে অপরাধী। সে আমাকে আজও ক্ষমা করতে পারেনি। ছাগলের খোয়াবের মতো জীবন খোয়ারে বন্দী হয়ে আছি শহুরে জীবনে। মেয়েরা আগেও নির্যাতিত হতো বিভিন্ন ভাবে। দুষ্টু মানুষ গুলো পরিবর্তন করছে তাদের কৌশল। পরিবর্তন করছে খোয়ার থেকে আবাসিক হোটেল। শহরে ব্যাঙের ছাতার মত গিজগিজ করে আবাসিক হোটেল।

আমি পুলিশ অফিসার হিসাবে জয়েন্ট করি রাজশাহীতে। তারপর বেশ ক’য়েক বছর পরে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকা মগবাজার শান্তা হোটেল রেড এলাট দেওয়ার পরে পুলিশের হাতে ধরা পরে এগারো জন। তার মধ্যে শীতল! আমি একটু ধাক্কা খেলাম। শীতলের দেহ ছিঁড়ে যেত পাপিষ্ঠ মানুষের আঘাতে। শীতল বাল্যকালে ঘায়েল হতো আরিফের নিষ্ঠুর আচরণে। জীবন যুদ্ধে পরাজিত শীতল এখন আমাদের আইনের খোয়ারে বন্দী। দুটি মুখ দু’টি শহরকে অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে আজ। মনে হচ্ছে অন্ধকার কবরের ভেতর থেকে শীতল চিৎকার দিয়ে বলছে বাঁচাও!

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

খোয়ার

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!