আনন্দ-বাগচী-২য়-পর্ব
লেখক পরিচিতি,  সাগতা,  সাহিত্য,  হাটখালী

আনন্দ বাগচী (২য় পর্ব)

আনন্দ বাগচী (২য় পর্ব)

 

সাহিত্য মূল্যায়ন: বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত প্রথম কাব্যোপন্যাস রচিয়তা এবং পঞ্চাশ দশকের উজ্জ্বলতম কবিদের মধ্যে একজন হলেন আনন্দ বাগচী। 

কবি সুশীল রায়ের (১৯১৫-১৯৮৫) ভাষায়: ‘স্বগত-সন্ধ্যা’ যখন বের হয় তখন আনন্দ বাগচী অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। যে-কোনো সাহিত্য সভায় বা কবি সম্মেলনে যে নাম নিয়ে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বেশি আলোচনা হত সে হল আনন্দ বাগচী।’ আর যে কৃত্তিবাস (১৯৫৩) পত্রিকা, যা কিনা সে সময়ে তরুণ কবিদের আত্মপ্রকাশের প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠতে পেরেছিল, সেই পত্রিকার সঙ্গেও ছিল আনন্দ বাগচীর যুক্ততা। হয়তো তেমন নিবিড় নয়, কিন্তু সংযোগটা ছিল তো! 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের বর্ষাকালে (শ্রাবণ ১৩৬০) প্রকাশিত হয় প্রথম সংখ্যা কৃত্তিবাস। আমি তখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র, বয়েস উনিশ। কারাবাসের কারণে দুটি বছর নষ্ট হওয়ায় দীপক (দীপক মজুমদার) পড়ে ফার্স্ট ইয়ারে স্কটিশ চার্চ কলেজে; তাঁর সহপাঠী আনন্দ বাগচী, যাঁর কবিতা তখন সমস্ত পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। ও রকম খ্যাতিমান একজনকে সম্পাদকমণ্ডলীতে নিয়ে আমরা পত্রিকার গৌরব বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলাম।”

এই ‘কৃত্তিবাস-প্রকাশনী’ থেকেই আনন্দ বাগচীর প্রথম কবিতার বই “স্বগতসন্ধ্যা” প্রকাশিত হয় ১৩৬০ বঙ্গাব্দে। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুকে। কেন, বুদ্ধদেব বসু কেন? আনন্দ বাগচীর ভাষায় : ‘কবিতা’ সম্পাদক আমাকে কৌলিন্য দিয়েছিলেন।’ এ-কথা তো সত্যিই। কেননা, আনন্দের ‘ভোগবতী’ বা ‘জলসিঁড়ি’র মতন লেখা কবিতা পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। কী ছিল সেইসব কবিতায়?

জল-শাড়ি-পরা এমন সুরেলা সকাল বেলায়

কাকে একাঘরে ভালোবাসি, মন?

মুখোমুখি কার সাথে মাতি বলো বিন্তি খেলায়

নানা হৃদয়ের তাসে উন্মন?

‘কাকে ফাঁকাঘরে ভালোবাসি, মন?

(‘জলসিঁড়ি’)

আবু সয়ীদ আইয়ুব-সম্পাদিত পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতার (সিগনেট, ১৩৬৩) কথা  বলা দরকার।  ‘জলসিঁড়ি’ ও ‘কাকতালীয়’ – আনন্দ বাগচীর এই দুটি কবিতা তাঁর এই সংকলনে নিয়েছিলেন আইয়ুব। 

আরও পড়ুন  কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক বিমল কুণ্ডু

আবু সয়ীদ আইয়ুবের সংকলনটিতে শঙ্খ ঘোষ (‘দিনগুলি রাতগুলি : ৮ জানুয়ারি রাত্রি’) কিংবা সুনীল গঙ্গোপ্যাধায়ের (‘তুমি’) মতন কবিদের একটি মাত্র কবিতাই স্থান পেয়েছিল। আমাদের শামসুর রাহমানেরও দুটি কবিতা (‘মনে-মনে’ ও ‘তার শয্যার পাশে’) স্থান পেলেও তিনি ছিলেন ‘রহমান’ নামে। 

পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতায় দুটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করে আবু সয়ীদ আইয়ুব যে আনন্দ বাগচীকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে গিয়েছেন – অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সে-কথাটি জানিয়েছিলেন আনন্দ বাগচী। এ-ও বলেছিলেন যে, ‘এই ত্র্যহস্পর্শে কবি হিসেবে আমি সে যাত্রা টিকে গেলাম।’

অন্যদিকে আবার, কৃত্তিবাসের সঙ্গে আনন্দ বাগচীর সম্পর্ক ক্রমে-ক্রমে যেমন শিথিল হয়ে এসেছিল, তেমনি সেখানে তাঁর প্রকাশিত কবিতার সংখ্যা ধীরে-ধীরে কমে আসতে থাকে। তারপরেও তো অস্বীকার করা যাবে না যে ‘একটি ব্যক্তিগত পত্র’ বা ‘আত্মবিলাপে’র মতো কবিতা কৃত্তিবাসেই প্রথম ছাপা হয়েছিল-

এ মন-মৃগ-মদে        তা হলে দ্বিধা কেন?

পেয়ালা সাকী-সখী,    আকাশে তুলে ধরো

হৃদয় থরোথরো         আকাশে তুলে ধরো,

তুমি তো মেঘ-মেয়ে,   তোমার দ্বিধা কেন!

তাহলে মুছে দাও         কাজরী-কল্পনা

জীবন জ্যামিতির         সজল জল্পনা।

আপাতদৃষ্টে মনে হতেই পারে বুঝি মোহিতলাল বা নজরুলের অনুকরণ, কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে নিজের স্বাতন্ত্র্যটুকু এই কবিতাটির মধ্যে দিয়ে ঠিকই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। এর মূল কারণ এই যে, আনন্দ বাগচীর কবি-প্রতিভা কখনই নিষ্প্রভ ছিল না। এছাড়া এখানে শাব্দী-ব্যঞ্জনার যে-বৈচিত্র্য, তা কবিতার সৌন্দর্য ক্ষুন্ন না-করেও কবির কল্পনাশক্তিকে যেমন বিভাবিত করেছে, তেমনি বিভাসিতও ।

আরও পড়ুন কবি আবদুল গনি হাজারী

স্বগতসন্ধ্যা আর তেপান্তরকে বাদ দিয়ে পরবর্তীকালে উজ্জ্বল ছুরির নীচে (আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৭৭), বিস্মরণ (করুণা প্রকাশনী, ১৩৮৯)- এই দুইটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দ বাগচীর। শেষোক্ত কাব্যটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখনই তিনি কবিতার নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে বিস্মৃতপ্রায়। 

সে-বিষয়টি তাঁর নিজের কাছেও পরিস্কার হয়ে উঠেছিল। নতুবা এইভাবে কেন লিখবেন? –

আছি। দিন যাচ্ছে তবু আছি।

সকালের চিনি ছাড়া চায়ের সঙ্গে

পেপার স্যান্ডুইচ।

খবরের কাগজের পাঁচের পাতা…

হেডলাইন টপকে, কলমের ভাঙা

শেষ তলানি

আমিও এখন পঞ্চম পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য

এই পঞ্চাশোর্ধ্বে।

(‘কেমন আছেন’, বিস্মরণ)

বিস্মরণই আনন্দ বাগচীর শেষ কাব্য – তথ্য হিসেবে এটি কিন্তু সত্যি নয়। বাগচীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটির সঙ্গে একই মলাটের ভেতর প্রকাশিত হয়েছিল নতুন কাব্য ‘আড়ালে খেলছিল সে’। এই বিষয়টি নিয়ে করুণ ব্যঙ্গও করেছিলেন তিনি শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায়। বলেছিলেন : চারখানা মরা বইয়ের মুখ আবার দেখতে পাওয়া যাবে, সেই সঙ্গে একখানা জ্যান্ত বইয়ের। কেমন জ্যান্ত? না, যে কখনো ভূমিষ্ঠই হয়নি। তার নাম ‘আড়ালে খেলছিল সে’, ঠিকই তো, আড়ালেই খেলছিল, ছাপাখানার বাইরে আসেনি। (শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশের পরে আনন্দ বাগচীর নতুন আর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল কিনা তা  জানা নেই) তবে আনন্দ বাগচী কবিতার জগৎ থেকে যে একরকম স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিলেন, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, এসব স্বেচ্ছানির্বাসনের পেছনে কবিদের ব্যক্তিগত পরাজয়ের, ব্যর্থতার বা দুর্ভাগ্যের কোনো-না-কোনো (এক বা একাধিক) করুণ কাহিনি জড়িয়ে থাকে। সব কবির জীবনেই এরকম ঘটনা কম-বেশি হয়তো ঘটে, কিন্তু, সকলেই  তো আর তেমন করে সেসব সামলে নিতে পারেন না। মনে হয়, আনন্দ বাগচীও পারেন নি। তাঁর কবিখ্যাতি যখন তুঙ্গে, সেইসময়কার ব্যক্তিগত বিপন্নতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত গদ্যে বলেছিলেন, ‘আমার অজ্ঞাতবাস এবং নির্বাসনের পালা শুরু হতে যাচ্ছে এই সময়। প্রেমের দায়ে প্রায় আকণ্ঠ ডুবে আছি তখন। লেখালিখি, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা – সামাজিক সব বন্ধনগুলোই আলগা হতে হতে শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে গেছে। এইভাবে প্রায় বছর দুই প্রেম নামক বেকার ভাতায় দিনযাপন প্রাণধারণ করে কলকাতা থেকে আচমকা বিদায় নিলাম।’

আরও পড়ুন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন

বোঝাই  যাচ্ছে জীবন-জীবিকার প্রশ্নে, অন্য আরো অনেকের মতো তাঁকেও হিমশিম খেতে হয়েছে। জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের যোগ মেলানো ক্রমশই যেন কঠিন থেকে কঠিনতর হতে শুরু করেছিল। ঠিক এমনই সময় তিনি কলকাতা থেকে বিদায় নিলেন। বলা উচিত কলকাতাকে তাঁকে বিদায় জানাতে হলো,‘কলেজের চাকরি নিয়ে চলে গেলাম বাঁকুড়ায়। আমার নাগর-জীবনের পাট চুকিয়ে দূর মফস্বলে, রাতারাতি যেন বদলে গেল আমার জল হাওয়া মাটি আর জীবনযাপনের ছন্দ।’

এই ছন্দকে অস্বীকার করার প্রাণপণ চেষ্টা তাঁর মধ্যে ছিল। আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কলকাতায় ফিরে আসার জন্যে, কিন্তু জীবন-জীবিকার কঠিন থেকে কঠিনতর সেই সংগ্রামের দিনগুলিতে সেটি আর সম্ভব হয়নি। এ-প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘বছর দুই তিন পালাই  পালাই করলাম, কলকাতার জন্যে মন প্রাণ অস্থির, আবাল্যের বন্ধুদের জন্যে ছটফট করছি কিন্তু ভাগ্যের অভিরুচি বোধহয় অন্যরকম। স্থায়ীভাবেই যেন বাঁধা পড়ে গেলাম বাঁকুড়ায়।’

বাঁকুড়ার বিখ্যাত ক্রিশ্চান কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হলেন। প্রায় সতেরো বছর তিনি ছিলেন তাঁর প্রিয় শহর, কবিতার শহর, কলকাতা থেকে দূরে। কতটা দূরে? তিনি নিজেই জবাব দিয়েছিলেন, ‘কলকাতা থেকে মাত্র  একশো চুয়াল্লিশ মাইল দূরে।’ সেইসঙ্গে তাঁর পাঠকদেরকে এটিও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘এই দুর্গমতার হিসেব মাইল স্টোনে মাপা যাবে না।’

জীবনযাপনের ছন্দ যখন বদলে যায় তখন কবিতার ছন্দও তো বদলে যেতে বাধ্য। আবার কখনো-কখনো জীবনের এই পরিবর্তিত ছন্দ আগ্রাসী ভূমিকায় কবির আত্মপ্রকাশের ছন্দটাকেই বরং গিলে খাবার চেষ্টা করে। আনন্দ বাগচীর ক্ষেত্রে তেমনটিই ঘটেছিল। বেদনাহত হৃদয়ে আশাহত কবি তাঁর এই জীবনযাপনের পরিণতি সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘প্রাচীন পুঁথির মত ধুলোয় ভরা এই আদিম শহর এবং শহরতলী… শাল পিয়াল মহুয়া সেগুনের পাতা পোড়ানো লু… প্রবল জ্বরের ঘোরের মত এর আসন্ধ্যা দুপুর আমাকে নিঃশব্দে কেড়ে নিল।

আরও পড়ুন মাওলানা রইচ উদ্দিন

এভাবেই ঘটে গেল একজন কবির কাব্যিক-মৃত্যু। কবির অভিপ্রায়, কখনো-কখনো তাঁর নিজেরও অনিচ্ছায় বা অজান্তে, নৈঃশব্দ্যকে আমন্ত্রণ জানায়। এটি হচ্ছে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যে এক মৃত্যুর অধিক মৃত্যু। যা মেনে নেওয়া যায় না আবার এড়ানোও যায় না। আনন্দ বাগচী তাঁর সেইসময়কার কথা জানাতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এই সময়টা আমার জীবনে… এক হিসেবে খোয়াই পর্ব। বাঁকুড়া আমার জীবনে প্রকৃত অর্থেই  মল্ল¬ভূমি।  দুঃখ-মৃত্যু-সফলতা-বিচ্ছেদ মিলিয়ে কেবল ঘটনার পর ঘটনা, কেবলই ভাঙচুর আর একলা হওয়ার ইতিহাস; উপচে-পড়া সময়ের নিস্তরঙ্গ গুরুভার বহন করে যাওয়া। এই সময়টা বলতে গেলে আমার না-লেখার নৈরাজ্য। যা লিখেছি সে নিতান্তই অনিয়মিত অভ্যাসবশে বা বাইরের ফরমাসে।

অভ্যাসবশে লেখা বা শুধুই ফরমাসে লেখায় যে প্রাণস্পন্দ থাকে না সেটি আনন্দ বাগচী বুঝবেন না তো কে বুঝবেন। কোনো আত্মসচেতন কবিই নিজের ভেতরের এই নৈরাজ্যকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে পারেন না। যে কারণে তাঁকে লেখা বন্ধ করে দিতে হয়।

এই প্রস্থানপর্বের জীবনেও আনন্দ বাগচী তাঁর সাহিত্যকর্মে একটিমাত্র সোনা ফলিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে “স্বকালপুরুষ” নামে কাব্যোপন্যাস রচনা। এমনিতেই উপন্যাস তিনি বেশ কয়েকটি লিখেছিলেন, কিন্তু কাব্যোপন্যাস ওই একটিমাত্র। ধ্রুপদী প্রকাশন থেকে এটি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৭০ বঙ্গাব্দে। তারও আগে সুশীল রায়ের ধ্রুপদী পত্রিকায় কাব্যোপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। মূলত সুশীল রায়ের প্ররোচনাতেই এরকম একটি অসম্ভব কাজ সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন আনন্দ বাগচী। এ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে পাঠকদের কাছে ‘কৈফিয়ত’ দিতে গিয়ে আনন্দ বাগচী বলেছিলেন, ‘বেশ কিছুকাল আগেই উপলব্ধি করেছিলাম, কবিতার কোনো নিরপেক্ষ পাঠক নেই।… সাম্প্রতিককালে এক ধরনের কবিতাবিমুখী মনোভাব বহু গদ্যলোভী পাঠকের মধ্যে গড়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন  কবি ও গল্পকার খলিফা আশরাফ

আধুনিক কবিতা অর্বাচীন এবং নির্বচনীয়, ভ্রান্তিকর এবং শ্রান্তিকর এবং উদ্ভট – এমন বিদ্রুপাত্মক  লোকশ্রুতি সংক্রামক হয়ে উঠেছে। অথচ কবিতা অব্যয় এবং কবিতা যে ফুরিয়ে যায়নি, তার যে আরো অফুরন্ত অনুশীলনের অবকাশ রয়েছে, এই কথা জানান দেবার ইচ্ছা সেই সময় থেকেই জেগেছিল।… পরে কলকাতা থেকে দূরে চলে গিয়ে স্মৃতিজীবী কলকাতাকে আরো নতুন আভাসে দেখতে পেলাম। গদ্য উপন্যাসে এদের চিত্রিত করতে গিয়ে মন তৃপ্ত হল না। ব্যক্তিগত বেদনা এবং নিঃসঙ্গতার আবেগ, কবিতা বা গানের চেয়ে আর কিছুতেই ভালো ফোটে না। সেইজন্যেই স্বকালপুরুষ-এর সৃষ্টি।’

এই গ্রন্থের একটি দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯২ সালে (প্রকাশক মহাদিগন্ত)। রানীবালা আর নিখিলেশের অমৃতে গরল আর গরলে অমৃতের কাহিনি নিয়েই তো এই স্বকালপুরুষ। আমাদের বাংলা সাহিত্যে এরকম কাব্যোপন্যাস খুব একটা রচিত হয়নি। এমনিতেই তো আমাদের কাব্যোপন্যাসের সংখ্যাও তো তেমন কিছু নয়। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে, আমাদের কবিদের কাছে, এখনো পর্যন্ত, সাহিত্যের এই ধারাটি প্রায় অপরীক্ষিতই রয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাঁকুড়ার পাট চুকিয়ে দিয়ে তাঁর সেই কলকাতাতেই ফিরে এসেছিলেন আনন্দ বাগচী। কিন্তু ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সতেরো বছর তো আর কম দীর্ঘ সময় নয়! কলকাতায় ফিরে এলেও, মনে হয়েছে, তিনি তাঁর জীবনের কলকাতা পর্ব যেন অতিক্রম করে ফেলেছিলেন। যে কারণে শারীরিকভাবে ফিরলেও মনোগত দিক দিয়ে আর ফিরতে পারেননি। সেইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই কবির বয়সও তো হয়েছিল। প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষেরই একটা নির্দিষ্ট বয়স থাকে; যার পরে, সেই ‘না শুরুর পর্ব’ থেকে নতুন করে আর কিছুই শুরু করা যায় না। লুপ্তপ্রায় সংযোগকে নতুন গতিপথে ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যর্থতা, কবি আনন্দ বাগচীও, যেন তাঁর সমুচিত বাস্তব-বোধ থেকেই মেনে নিয়েছিলেন, ‘কলকাতায় ফিরে এসেছি কিন্তু এখনো আমার না লেখার পর্বই চলেছে। ইতস্তত কিছু খাপছাড়া গদ্যে কলম জ্বালিয়ে রাখলেও মন তৈরী হয়নি এখনও। যতদূর তাকিয়ে আছি কবিতার চিহ্নও নেই।… নতুন বিষয় নতুন মাধ্যম খুঁজছি, পাচ্ছি না, পাবো কিনা তাও জানি না। সেই বয়স সেই আবেগ হারিয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন কবি ও কথাশিল্পী ডা. আবু জাফর খান

কবিতা রচনার নামে ব্যক্তিপুরুষের আত্মানুভূতির নিছক যান্ত্রিক প্রকাশ ও পুনরাবৃত্তি তাঁকে প্রলোভিত করেনি। সেই কারণেই কবির অহংকার নিয়েই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘কবিতায় বন্ধ্যাদশা এর আগেও একাধিকবার এসেছে… আবার কোনো নতুন ধ্বনি, নতুন প্রেরণা হয়তো হঠাৎই এসে যাবে… হয়তো আদৌ আসবে না, তবু প্রতিধ্বনি আর নয়।’ (দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮৭)

নমনীয় রূপবন্ধে জীবন মৃত্যুর সামঞ্জস্যতাকে মেনে নেওয়ার সক্ষমতাও আনন্দ বাগচীর ছিল-

যাওয়া খুব সহজ এখন…

দিনান্তে আয়নার দিকে চেয়ে মনে হয়

সামান্যই পরমায়ু…

চুকিয়ে দিয়েছি সব দাম।

যাওয়া খুব সহজ এখন

চোখের একফোঁটা জলে জমে আছে শেষ বিস্মরণ।

 

যে কবি এমনটি বলতে পারেন, ‘আমি আমার চোখ দিয়েই দেখি, আমার মত করেই লিখি। সেই দৃষ্টি ক্ষীণ হতে পারে, সেই লেখা অক্ষম হতে পারে কিন্তু তা একান্তই আমার নিজস্ব’ – কেবল তাঁর পক্ষেই এমন একটি স্বনির্ভর শর্ত দ্বিধাহীনভাবে মেনে চলা সম্ভব ছিল। কবি আনন্দ বাগচী আমৃত্যু তাঁর নিজের সেই ব্রত আঁকড়ে ধরেছিলেন।

আনন্দ বাগচীর কবিতায় জীবনানন্দীয় ইন্দ্রিয়বেদত্তা লক্ষ্য করা গেলেও তাকে হয়ত সুররিয়ালিস্ট তকমা দেওয়া যায়না বরং বোধের চেয়েও সেখানে পংক্তির ফাঁকে ফাঁকে লেগে থাকা সচেতন চিত্ররূপময়তা মায়াবী জাদুবলে পাঠককে ধরে রাখে। ছবি প্রসংগে যামিনী রায়কে লেখা চিঠিতে একবার রবীঠাকুর লিখেছিলেন-“ ইন্দ্রিয়ের ব্যবহারে আমাদের জীবনের উপলব্ধি। এজন্য তার একটি অহেতুক আনন্দ আছে। চোখে দেখি- সে যে কেবল সুন্দর দেখে বলি, খুশি হই, তা নয়। দৃষ্টির ওপরে দেখার ধারা আমাদের চেতনাকে উদ্রেক করে রাখে। সে রূপের রেখা এড়াবার জো নেই। যা মনকে অধিকার করে নেয় কোন একটা বিশেষত্ব বশতঃ তা সুন্দর হোক বা না হোক, মানুষ তাকে আদর করে নেয়। তার তার চারদিকের সৃষ্টির ক্ষেত্রকে পরিপূর্ণ করতে থাকে।” 

আরও পড়ুন কৃষি বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীনগ

আনন্দ বাগচীর প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই আমরা এমনই একটা করে দেখার প্রেক্ষাপট দেখতে পাই। তার চারপাশের সমস্ত পার্থিব সমস্ত প্রকৃতিকে কবি যে কেবল নিরীক্ষা করেছেন তা নয় বরং স্থল জল অন্তরীক্ষের একটা সম্পূর্ণ ক্যানভাস যেন তার বেশিরভাগ কবিতার পান্ডুলিপি হয়ে ঊঠেছে। এক একটা ছবি যার দৃশ্যগুণ কেবল সময়ের নয় বরং আবহমানের দরখাস্ত জমা করে গেছে পাঠকের হাতেও। “স্যানিটোরিয়ামের চিঠি” কবিতায় আনন্দ বাগচী লিখলেন-

পনের নম্বর বেড খালি হল। আটমাস পরে আজ রাতে

বিছানা সরানো হলো,চ্যাপ্টা, বেঁটে ওষুধের শিশি

মেজার গ্লাসের পাশে সারি সারি সাজানো, শিয়রে

রিপোর্ট টেবলখানা, এখনো রয়েছে, কাল ভোরে

সমস্ত অদৃশ্য হবে, সাদা একটি চাদর বিছিয়ে

মৃত্যুকে আবার ঢেকে দেওয়া হবে, নতুন মানুষ বাসা বাঁধবে” 

 

আবার “অন্যমনে” কবিতায় তিনি লিখলেন-

‘পড়েছ অস্ফুট ছায়া মুখে চোখে পিছল বুকের

ঘাটে ঘাটে, যৌবনের বেলা যাচ্ছে কাজলা দীঘির

জল কাঁপছে থিরথিরিয়ে , জলে ঢেউ দিও না, দিও না,

দোলন চাঁপার মত একটি সুখের

ছায়াকে ভেঙ্গো না তুমি এই পাতাঝুরির শিশির”

জীবন থেকে মৃত্যু সমস্ত রংগুলোকেই যেন যত্ন করে অক্ষরে বিন্যাস করেছেন আনন্দ বাগচী। তাঁর কাব্যের নিবিড় পাঠে আমরা এক ধরনের প্রতীকবাদ লক্ষ্য করতে পারি যেখানে কবি গন্ধকে স্পর্শে স্পর্শকে দৃশ্যে দৃশ্যকে শব্দে শব্দকে ধ্বনিতে পরিনত করেছেন অনায়াসে, যার ফলে অক্ষরের মাঝে উঠে আসে দৃশ্যের প্রত্যক্ষতা। প্রতীকের মধ্যে দিয়ে তিনি যে জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন সেখানে রয়েছে অনুভূতির বিপুলতা; আর এই দৃশ্যান্তরের শেষে এসে পাঠকও যেন জীবনের মধ্যে তলিয়ে যাওয়ার রসদ খুঁজে পায়; শুরু হয় কবিতার পুনরুজ্জীবন।

আরও পড়ুন আনন্দ বাগচী
১ম পর্ব
শেষ পর্ব

 

তথ্যসূত্র: 

✔কালি ও কলম, মিলনসাগর

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

আনন্দ বাগচী (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন।বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!